নিজস্ব প্রতিনিধি, পশ্চিম মেদিনীপুর সরস্বতী পুজো ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রস্তুতি বৈঠক থেকেই ছড়াল আতঙ্ক। মেদিনীপুর শহরের অলিগঞ্জ ঋষি রাজনারায়ণ বালিকা বিদ্যালয়ে বৈঠক চলাকালীন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এক প্রবীণ শিক্ষিকা। পরিবারের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডার জেরেই ক্যান্সার আক্রান্ত ওই শিক্ষিকার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা শহরে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।অসুস্থ শিক্ষিকার নাম যমুনা ঘোষ পালোধী। বয়স ৫৯। প্রায় তিন দশক ধরে ওই বিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার শিক্ষকতা করছেন তিনি। শুক্রবার দুপুরে বিদ্যালয়ে সরস্বতী পুজো ও বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত একটি প্রশাসনিক বৈঠক বসে। অভিযোগ, সেই বৈঠকেই প্রধান শিক্ষিকা সুজাতা গোস্বামীর সঙ্গে যমুনা দেবীর তীব্র মতবিরোধ হয় এবং পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, যমুনা ঘোষ পালোধী গত কয়েক বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত। নিয়মিত কেমোথেরাপি চললেও স্কুলের দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছিলেন।
শুক্রবার বৈঠকের সময় মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জ্ঞান হারান। তড়িঘড়ি তাঁকে মেদিনীপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিটি স্ক্যানের পর চিকিৎসকেরা জানান, তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।অসুস্থ শিক্ষিকার স্বামী শিশির পালোধী বলেন,“আমার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছে। সেই অবস্থায় তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে। মানসিক আঘাত সামলাতে না পেরেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ব্রেন স্ট্রোকের কারণেই শরীরের নীচের অংশ অবশ হয়ে গিয়েছে। প্রয়োজনে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে।”তিনি আরও জানান, স্ত্রী কিছুটা সুস্থ হলেই প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ করা হবে।এদিকে এই ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকাও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁকে শহরের অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে শুক্রবার বিকেল থেকে বিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়।
বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির এক সদস্য বলেন,“একটি প্রশাসনিক বৈঠকে মতবিরোধ হয়েছিল। দুই শিক্ষিকা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”ঘটনায় বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অসুস্থতার কারণে যমুনা দেবী গত কয়েক বছরে কিছু ছুটি নিয়েছিলেন। সেই বিষয়টি নিয়েই হয়তো মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। যদিও শিক্ষাদানে তাঁর কোনও গাফিলতি ছিল না।বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরা ও অভিভাবকদের একাংশ এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, শহরের অন্যতম প্রাচীন ও সম্মানজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ঘটনা শিক্ষা ব্যবস্থার অস্বস্তিকর ছবিই তুলে ধরছে।মেদিনীপুর পুরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন খান বলেন,“একজন অসুস্থ ও অভিজ্ঞ শিক্ষিকার সঙ্গে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।”ঘটনাকে ঘিরে শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা, কর্মক্ষেত্রে আচরণবিধি ও মানবিকতার প্রশ্ন উঠে এসেছে। এখন সকলের নজর একদিকে যমুনা ঘোষ পালোধীর শারীরিক অবস্থার দিকে, অন্যদিকে বিদ্যালয় প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।