নিজস্ব প্রতিনিধি, পশ্চিম মেদিনীপুর: সকালটি বালিচকের মানুষের কাছে ছিল একেবারে অন্যরকম। ভোরবেলা বাজার খুলতেই দেখা মিলেছিল এক অচেনা বৃদ্ধার। বয়স প্রায় বাষট্টি। পরে জানা যায়—সবংয়ের নীলা এলাকার বাসন্তী সামন্ত। কিন্তু সকাল থেকে তাঁর আচরণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছিল।হঠাৎ অস্বাভাবিক কেনাকাটা—চমকে যান বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতারা। বুধবারের সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ বাসন্তীদেবী প্রথম ঢোকেন মাছের দোকানে—এবং একেবারে ১৩ হাজার টাকার মাছ কিনে ফেলেন। এরপর সোজা ডাবের দোকানে—সেখানে আরও ৩ হাজার টাকার ডাব নিলেন। তারপর সবজি দোকান, ভূষিমাল, মুদি—যেকোনো দোকানে যেখানে দাঁড়িয়েছেন, যা দেখেছেন—বিনা দরদামে বলেই কিনে নিয়েছেন!দোকানদাররা হতবাক, ক্রেতারা বিস্ময়ে তাকিয়ে। কারও প্রশ্নের উত্তরে একই কথা—“টাকা দিয়ে তো কিনছি!”
তাঁর কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা, চোখে ক্লান্তি আর দূরদৃষ্টি। যেন মন ঠিক কোথাও নেই।মানুষ বুঝেছিল কিছু একটা ঠিক নেই… কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাজারের কয়েকজন এগিয়ে এসে কেনা জিনিস ফেরত নিতে বলেন। মাছ ও ডাব দোকানদার টাকা ফেরত নিলেও বাকি বিক্রেতারা নেননি।সবার মনে একই প্রশ্ন—হঠাৎ এত কেনাকাটা কেন? বৃদ্ধা কি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন? নাকি কোনো গভীর দুঃশ্চিন্তা…?সকালের সেই কৌতূহল ক্রমে দোল খেতে থাকে অস্বস্তিতে।
কিন্তু কেউই ভাবতে পারেননি, কয়েক ঘণ্টা পর কী ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে।দুপুরে ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা—করমণ্ডল এক্সপ্রেসে কাটা পড়ে মৃত্যুবেলা বাড়তেই হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে—বালিচক রেলগেটের কাছে লাইন পার হতে গিয়ে করমণ্ডল এক্সপ্রেসে কাটা পড়েছেন এক বৃদ্ধা। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু।পরে স্থানীয়দের সাহায্যে পুলিশ শনাক্ত করে—সকাল থেকে বাজারজুড়ে যার কথা হচ্ছিল, তিনিই মৃত—বাসন্তী সামন্ত।শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এক অজানা প্রশ্নের ছায়া!কেন যেন মনে হচ্ছিল তিনি কোথাও পৌঁছানোর তাড়ায় ছিলেন…কেন এত কেনাকাটা করছিলেন?কেন এমন তাড়াহুড়ো?কোথায় যেতে চেয়েছিলেন?কারও উত্তর জানা হলো না।বালিচক বাজারের মানুষ এখনো বলছেন—“সকালে যাকে দেখলাম, সন্ধ্যায় তার এমন পরিণতি—মনে হচ্ছে যেন একটা রহস্যের ভেতর দিয়ে গেলাম।”বাসন্তী সামন্তের আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু বাজারের মানুষের মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা রেখে গেল। যেন এক দিনের মধ্যে তাঁর জীবনচক্র বাজার থেকে রেললাইনে শেষ হয়ে গেল… রেখে গেল বহু প্রশ্ন, অজানা বেদনা, আর এক অনির্বচনীয় গল্প।