শাজাহান তালুকদার ,আলিপুরদুয়ার: আলিপুরদুয়ার: সবুজ চা-বাগানের কোলে থাকা ছোট্ট এক গ্রাম থেকে উঠে এসে নিজের লড়াইয়ের জোরে গোটা উত্তরবঙ্গে পরিচিতি পেয়েছে এক স্বপ্নবাজ মেয়ে — মৌমিতা খাতুন। আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট ব্লকের হান্টাপাড়া চা-বাগানের বাসিন্দা মৌমিতা আজ ডুয়ার্সের গর্ব।চা শ্রমিক পরিবারের জন্ম এই মেয়ের। শৈশবেই বাবাকে হারানোর পর মা একাই সংসারের ভার কাঁধে নেন।
প্রতিদিন বাগানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চা পাতা তোলা, ঘরে ফিরে তিন সন্তানকে মানুষ করার সংগ্রাম— সেই কঠিন বাস্তবতাই মৌমিতার জীবনে গড়ে তুলেছিল লড়াইয়ের মানসিকতা।মাদারিহাট স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থেকেই শুরু হয় তার পথচলা। পরে ফালাকাটা কলেজে ভর্তি হয়ে খেলাধুলায় আরও মন দেয়। প্রথমে ক্যারাটে দিয়ে শুরু হলেও সিকিমে এক প্রতিযোগিতার সময় জীবনের মোড় ঘুরে যায় — সেখানেই প্রথমবার হাতে পরে বক্সিং গ্লাভস।সেই প্রথম সুযোগই জীবনের দিশা দেখায় মৌমিতাকে।এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকায়নি সে।
কঠিন সংগ্রাম, সীমাহীন পরিশ্রম, আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে একের পর এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করে।বাড়ি থেকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যেতে হত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। গাড়ি ভাড়ার টাকাও অনেক সময় থাকত না। তবুও সে হাল ছাড়েনি। অনেকদিন হেঁটে, কখনো বন্ধুদের সাহায্যে পৌঁছে গেছে প্রশিক্ষণে।আজ সেই মেয়েটিই জেলা ও রাজ্য স্তরের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ২৫টি মেডেল জিতে নিয়েছে। চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের এই মেয়ে আজ গোটা উত্তরবঙ্গের পরিচিত মুখ — ডুয়ার্সের গর্ব।মৌমিতা জানায়, “মা আমাকে কখনো থামতে দেননি। মা-ই আমার অনুপ্রেরণা।
ছোটবেলা থেকে দেখেছি মা কীভাবে লড়ে গেছেন, আমি শুধু সেই লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছি রিংয়ের ভেতরে।”মৌমিতার মা আজও বাগানে কাজ করেন। তবুও মুখে তৃপ্তির হাসি — “মেয়ে আমার নাম করেছে, এতেই গর্ব।”ডুয়ার্সের এই কন্যা আজ প্রমাণ করে দিয়েছে, কষ্ট যতই হোক, স্বপ্ন যদি দৃঢ় হয়, তবে পাহাড়-সম বাধাও একদিন পেরিয়ে যাওয়া যায়।আমাদের ডুয়ার্সে এমন অনেক ছেলে-মেয়ে আছে, যারা নীরবে নিজেদের দক্ষতা ও প্রতিভা দিয়ে আলোকিত করছে এই অঞ্চলকে।

কিন্তু তাদের খবর আমরা অনেক সময় পাই না।ডুয়ার্সের সেই অজানা প্রতিভা, সেই নীরব সংগ্রামী মুখগুলোকেই আমরা পৌঁছে দেব মানুষের সামনে — কারণ প্রতিটি সাফল্যের পেছনে থাকে এক অজানা গল্প, যা আমাদের শেখায় বাঁচতে, লড়তে, জিততে। ছোট্ট গ্রাম থেকে বড় স্বপ্ন — এটাই মৌমিতা খাতুনের জীবনের আসল পরিচয়।